এই লেখায়
হিমছড়ি গিয়ে হতাশ হবেন না — এই কথাটা আগে বলে নিচ্ছি, কারণ হিমছড়ি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা ঝরনাকে ঘিরে। অনেকেই ছবিতে ভরা ঝরনা দেখে যান, আর গিয়ে দেখেন পাথর শুকনো। সত্যিটা হলো, বর্ষা ছাড়া হিমছড়ি ঝরনায় সাধারণত পানি থাকে না। তাহলে কি হিমছড়ি যাওয়া বৃথা? মোটেও না — শুধু প্রত্যাশাটা ঠিক করে যেতে হয়। আর ইনানী? ইনানীর আসল রূপটা দেখা যায় ভাটার সময়, যখন কোরাল পাথর আর টাইড পুল বেরিয়ে আসে। জোয়ারের সময় গেলে সেই রূপটা মিস করবেন। এই পোস্টটা সেই দুটো সত্যি কথা দিয়ে শুরু — তারপর একদিনে ইনানী আর হিমছড়ি ঘোরার পুরো প্ল্যান, খরচ আর যাতায়াত। Inani Beach আর Himchari নিয়ে যারা খুঁজছেন, তাদের জন্য এটাই সৎ গাইড।
প্রথম প্রশ্ন: হিমছড়ি ঝরনায় কি এখন পানি আছে?
সোজা উত্তর: বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) হ্যাঁ, পানি থাকে আর ঝরনাটা দেখার মতো হয়। বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে সাধারণত পানি থাকে না বা খুব কম থাকে। শুকনো মৌসুমে হিমছড়ি গেলে ঝরনার আশা ছেড়ে যান — তাহলে হতাশ হবেন না। শুকনো মৌসুমে হিমছড়ির আসল আকর্ষণ হলো পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্র দেখা, আর ইকোপার্কের সবুজ। ৩০০ ফুট সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলে একদিকে পাহাড়, আরেকদিকে বঙ্গোপসাগর — এই ভিউটাই তখন মূল পাওনা। হিমছড়ি ন্যাশনাল পার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮০ সালে, আর ইকোপার্কে ঢুকতে প্রবেশ টিকিট আনুমানিক ৩০–৩৫ টাকা।
একটা সতর্কতা: কোনো কোনো পুরনো ব্লগে হিমছড়ির প্রবেশ ফি অনেক বেশি দেখানো আছে — সেটা যাচাই করা যায়নি, তাই ওই অঙ্কটা ধরে বাজেট করবেন না। গেটে গিয়ে আসল ফি জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: একদিনে দুটো জায়গাই ঘোরা যায় তো?
হ্যাঁ, খুব সহজেই। কক্সবাজার শহর থেকে হিমছড়ি মাত্র ১২ কিলোমিটার, আর ইনানী প্রায় ২২–৩৫ কিলোমিটার (সূত্রভেদে দূরত্বটা একটু আলাদা লেখা থাকে)। মেরিন ড্রাইভ ধরে গেলে পথটাই একটা অভিজ্ঞতা — একপাশে পাহাড়, আরেকপাশে সমুদ্র। খুব সকালে বেরিয়ে দুপুরের মধ্যে দুটো জায়গা ঘুরে ফেরা যায়, তবে তাড়াহুড়ো না করে পুরো দিনটা হাতে রাখলেই ভালো।
আমার পরামর্শ: সকালে আগে হিমছড়ি, তারপর ইনানী। কারণ ইনানীর কোরাল দেখার সেরা সময় ভাটা, আর ভাটা সাধারণত দুপুরের দিকে পড়ে — সময়টা মিলিয়ে নিলে দুটো অভিজ্ঞতাই পুরো পাবেন। জোয়ার-ভাটার সময় দিনভেদে বদলায়, তাই যাওয়ার আগের দিন স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞেস করে নিন, বা কলাতলী এলাকার জিপ ড্রাইভারদের জিজ্ঞেস করুন — তারা রোজ এই রুটে যান।
মেরিন ড্রাইভে যাবো কিভাবে — জিপ না সিএনজি?
কলাতলী থেকে ইনানী–হিমছড়ি যাওয়ার কয়েকটা উপায় আছে, আর ভাড়ার ফারাকটা বড়। তাই আগেই ঠিক করে নিন কোনটা আপনার জন্য ঠিক।
| যানবাহন | আনুমানিক ভাড়া | কাদের জন্য ঠিক |
|---|---|---|
| জিপ রিজার্ভ (কলাতলী থেকে) | ১,৫০০–২,৫০০ টাকা | পরিবার বা দল, নিজের সময়মতো ঘোরা যাবে |
| চান্দের গাড়ি রিজার্ভ | ৪,০০০–৫,০০০ টাকা | বড় দল, সারাদিনের জন্য |
| লোকাল জিপ (জনপ্রতি) | ২০০–২৫০ টাকা | একা বা দুজন, বাজেট কম |
| সিএনজি রিজার্ভ | দরদাম সাপেক্ষ | ছোট দল, তবে মেরিন ড্রাইভে জিপই আরামদায়ক |
লোকাল জিপে গেলে খরচ কমে, কিন্তু নিজের সময়মতো থামা যায় না — ড্রাইভার যেখানে থামাবে সেখানেই নামতে হবে। রিজার্ভ জিপে গেলে হিমছড়িতে যতক্ষণ ইচ্ছা থাকা যায়, ইনানীতে ভাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায়। আমার মতে, ৪–৬ জনের দল হলে রিজার্ভ জিপই সেরা — ভাগ করলে জনপ্রতি ৩০০–৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়।
হিমছড়ি — ঝরনা নয়, ভিউটাই আসল (শুকনো মৌসুমে)
হিমছড়ি ইকোপার্কে ঢুকে প্রথমে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠুন। ৩০০ ফুট সিঁড়ি শুনতে কঠিন লাগলেও ধীরে ধীরে উঠলে ১৫–২০ মিনিটেই হয়ে যায়। ওপরে উঠলে একদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি, আরেকদিকে নীল সমুদ্র — কক্সবাজারের মূল সৈকতের ভিড় এখানে নেই। বর্ষায় গেলে ঝরনার পানি পাবেন, তখন ঝরনার কাছে কিছুক্ষণ বসে থাকা যায়। শুকনো মৌসুমে গেলে ঝরনার পাথরগুলো দেখে নিন, ছবি তুলুন, কিন্তু "ঝরনা কই?" বলে মন খারাপ করবেন না — আগেই জানতেন পানি থাকবে না।

ছবি: Moheen Reeyad, CC BY-SA 4.0, via Wikimedia Commons
হিমছড়িতে খাবারের দোকান আছে, তবে দাম শহরের চেয়ে কিছুটা বেশি। পানি সঙ্গে রাখুন, আর সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বয়স্কদের সঙ্গে গেলে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিন। পার্কের ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন — প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না।
ইনানী — ভাটার সময়ই আসল রূপ
ইনানী বিচ কক্সবাজারের মূল সৈকতের চেয়ে অনেক শান্ত। প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতে ভিড় কম, আর বালির বদলে এখানে কোরাল পাথরের ছড়াছড়ি। প্রবেশ ফ্রি — কোনো টিকিট লাগে না। কিন্তু ইনানীর আসল রূপ দেখতে হলে ভাটার সময় যেতে হবে। ভাটায় সমুদ্র সরে গেলে কোরাল পাথর বেরিয়ে আসে, আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে টাইড পুল তৈরি হয় — ছোট ছোট পানির গর্তে মাছ, কাঁকড়া দেখা যায়। জোয়ারের সময় গেলে পাথর ডুবে থাকে, আর ইনানীকে সাধারণ একটা সৈকত মনে হবে।
তাই ইনানী যাওয়ার আগে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নেওয়াটা এই ট্রিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। ভাটা দুপুরে পড়লে সকালে হিমছড়ি ঘুরে দুপুরে ইনানী যান। ভাটা সকালে পড়লে ক্রমটা উল্টে দিন — আগে ইনানী, পরে হিমছড়ি। কোরাল পাথরে হাঁটার সময় শক্ত জুতো পরুন, খালি পায়ে হাঁটলে পা কাটতে পারে। আর কোরাল ভেঙে বা তুলে আনবেন না — এটা পরিবেশের ক্ষতি করে, আর আইনতও ঠিক নয়।

ছবি: Abdul Kaium Tito, CC BY-SA 4.0, via Wikimedia Commons
ইনানীতে কিছু রেস্টুরেন্ট আর ছোট দোকান আছে — ডাব, চা, হালকা খাবার পাওয়া যায়। তবে দুপুরের ভারী খাবারের জন্য কক্সবাজার শহরে ফেরাই ভালো, কারণ ইনানীতে পছন্দ সীমিত আর দাম বেশি।
একদিনের খরচ — পুরো হিসাব
| খরচের খাত | আনুমানিক খরচ |
|---|---|
| জিপ রিজার্ভ (ভাগ করে, জনপ্রতি) | ৩০০–৫০০ টাকা |
| হিমছড়ি ইকোপার্ক প্রবেশ | ৩০–৩৫ টাকা |
| ইনানী প্রবেশ | ফ্রি |
| খাওয়া (দুপুর + ডাব/চা) | ৩০০–৫০০ টাকা |
| মোট (কক্সবাজার শহর থেকে, একদিন) | ৬৫০–১,০৫০ টাকা |
এই হিসাব কক্সবাজার শহরে থাকা অবস্থায় একদিনের ঘোরার জন্য — ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া-আসার বাস বা বিমান ভাড়া এর বাইরে। লোকাল জিপে গেলে খরচ আরও কমে, জনপ্রতি ২০০–২৫০ টাকায় যাতায়াত হয়ে যায়।
মিথ বনাম সত্যি — এক নজরে
প্রথম মিথ: হিমছড়ি মানেই ভরা ঝরনা। সত্যি: বর্ষা ছাড়া ঝরনায় পানি থাকে না; শুকনো মৌসুমে ভিউ আর পার্কই আকর্ষণ। দ্বিতীয় মিথ: ইনানী শুধুই একটা নির্জন সৈকত। সত্যি: ভাটার সময় কোরাল আর টাইড পুলই ইনানীর আসল চমক। তৃতীয় মিথ: মেরিন ড্রাইভে যেতে অনেক টাকা লাগে। সত্যি: লোকাল জিপে জনপ্রতি ২০০–২৫০ টাকায় যাওয়া যায়, আর দল বেঁধে রিজার্ভ করলেও ভাগ করে সস্তা পড়ে।
এই তিনটে সত্যি মাথায় রাখলে ইনানী–হিমছড়ি ট্রিপে হতাশ হওয়ার সুযোগই থাকে না। বরং অন্যরা যা মিস করে — ভাটার কোরাল, পাহাড়ের ওপর থেকে সমুদ্র — সেটাই আপনি দেখে আসবেন।
কক্সবাজারের মূল সৈকত, হোটেল আর খরচের পুরো ছবি পেতে কক্সবাজার ভ্রমণ গাইডটাও দেখে নিন, আর গন্তব্যের তালিকা মেলাতে চাইলে অচেনা বাংলার এক্সপ্লোর পেজে চোখ বুলিয়ে নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: হিমছড়ি ঝরনায় কি এখন পানি আছে? উত্তর: বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) পানি থাকে, অন্য সময়ে সাধারণত থাকে না। শুকনো মৌসুমে গেলে ঝরনা নয়, পাহাড় আর সমুদ্রের ভিউ-ই মূল আকর্ষণ ধরে যান।
প্রশ্ন ২: একদিনে ইনানী আর হিমছড়ি দুটোই ঘোরা সম্ভব? উত্তর: হ্যাঁ, খুব সহজেই। হিমছড়ি কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার, ইনানী ২২–৩৫ কিলোমিটার। খুব সকালে বেরিয়ে দুপুরের মধ্যে দুটোই ঘুরে ফেরা যায়।
প্রশ্ন ৩: ইনানীর কোরাল পাথর কখন দেখা যায়? উত্তর: ভাটার সময়। জোয়ারে কোরাল পাথর ডুবে যায়, ভাটায় বেরিয়ে আসে আর টাইড পুল তৈরি হয়। তাই যাওয়ার আগে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন।
প্রশ্ন ৪: মেরিন ড্রাইভে যাবো কিভাবে — জিপ না সিএনজি? উত্তর: রিজার্ভ জিপ আনুমানিক ১,৫০০–২,৫০০ টাকা, চান্দের গাড়ি ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, আর লোকাল জিপে জনপ্রতি ২০০–২৫০ টাকা। দল বেঁধে গেলে রিজার্ভ জিপই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
প্রশ্ন ৫: Inani Beach-এ কি প্রবেশ ফি লাগে? উত্তর: না, Inani Beach-এ প্রবেশ ফ্রি। আর Himchari ইকোপার্কে প্রবেশ টিকিট আনুমানিক ৩০–৩৫ টাকা।
প্রশ্নোত্তর
হিমছড়ি ঝরনায় কি এখন পানি আছে?
বর্ষাকালে (জুন–সেপ্টেম্বর) পানি থাকে, অন্য সময়ে সাধারণত থাকে না। শুকনো মৌসুমে গেলে ঝরনা নয়, পাহাড় আর সমুদ্রের ভিউ-ই মূল আকর্ষণ ধরে যান।
একদিনে ইনানী আর হিমছড়ি দুটোই ঘোরা সম্ভব?
হ্যাঁ, খুব সহজেই। হিমছড়ি কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার, ইনানী ২২–৩৫ কিলোমিটার। খুব সকালে বেরিয়ে দুপুরের মধ্যে দুটোই ঘুরে ফেরা যায়।
ইনানীর কোরাল পাথর কখন দেখা যায়?
ভাটার সময়। জোয়ারে কোরাল পাথর ডুবে যায়, ভাটায় বেরিয়ে আসে আর টাইড পুল তৈরি হয়। তাই যাওয়ার আগে জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন।
মেরিন ড্রাইভে যাবো কিভাবে — জিপ না সিএনজি?
রিজার্ভ জিপ আনুমানিক ১,৫০০–২,৫০০ টাকা, চান্দের গাড়ি ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, আর লোকাল জিপে জনপ্রতি ২০০–২৫০ টাকা। দল বেঁধে গেলে রিজার্ভ জিপই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
Inani Beach-এ কি প্রবেশ ফি লাগে?
না, Inani Beach-এ প্রবেশ ফ্রি। আর Himchari ইকোপার্কে প্রবেশ টিকিট আনুমানিক ৩০–৩৫ টাকা।
আরও পড়ুন ও দেখুন
ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন
জায়গার বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।

