এই লেখায়
খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে দুটো জায়গা একদিনে ঘোরা যায় — আলুটিলা গুহা আর রিছাং ঝরনা। সকালে ঝরনা, দুপুরে গুহা — এই ক্রমটা মানলেই দিনটা সবচেয়ে আরামদায়ক হয়। আর খরচ? ঢাকা থেকে গেলে জনপ্রতি আনুমানিক ১,৮০০–২,৫০০ টাকার মধ্যে পুরো একদিনের ট্রিপটা হয়ে যায়, যদি দল বেঁধে চান্দের গাড়ি ভাগ করে নেন। এই পোস্টে প্রথমেই পুরো বাজেটটা দিয়ে দিচ্ছি, তারপর ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্ল্যান, তারপর প্রতিটি জায়গার বিস্তারিত। Khagrachari ভ্রমণ গাইড খুঁজছেন যারা, তাদের জন্য এটাই সবচেয়ে কাজের অংশ — আগে টাকার হিসাব, পরে গল্প।
প্রথমে পুরো বাজেট — একদিনে কত লাগবে?
নিচের টেবিলটা একজন ভ্রমণকারীর জন্য, ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা ধরে, দল বেঁধে খরচ ভাগ করে। সব অঙ্ক আনুমানিক — মৌসুম আর দরদামের ওপর কিছুটা এদিক-ওদিক হবে।
| খরচের খাত | আনুমানিক খরচ (জনপ্রতি) | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ঢাকা–খাগড়াছড়ি বাস (নন-এসি, যাওয়া-আসা) | ১,৫০০–১,৭০০ টাকা | একদিক ৭৫০–৮৫০ টাকা |
| খাগড়াছড়ি শহরে চান্দের গাড়ি (ভাগ করে) | ৩০০–৫০০ টাকা | গাড়ি ২,০০০–৩,০০০ টাকা, ৬–৮ জন ভাগ করলে |
| আলুটিলা গুহা প্রবেশ টিকিট | ৪০–৫০ টাকা | ছুটির দিনে ৫০ টাকা হতে পারে |
| রিছাং ঝরনা প্রবেশ ফি | ১০–২০ টাকা | স্থানীয়ভাবে নেওয়া হয় |
| মশাল/টর্চ | ১০–১৫ টাকা | গুহার গেটের কাছে বাঁশের মশাল পাওয়া যায় |
| খাওয়া (দুপুর + হালকা নাশতা) | ৩০০–৫০০ টাকা | শহরের হোটেলে ভাত-মাছ-মাংস |
| মোট (একদিন, ঢাকা থেকে) | ২,২০০–২,৮০০ টাকা | দল বড় হলে কমে |
হাতে একটু বেশি রাখুন — পাহাড়ি পথে হঠাৎ চান্দের গাড়ির ভাড়া বেড়ে যেতে পারে, আর ফেরার বাস মিস হলে থাকার খরচ যোগ হবে। যারা খাগড়াছড়িতে এক রাত থাকতে চান, তাদের জন্য পর্যটন মোটেলে নন-এসি রুম আনুমানিক ১,৩০০ টাকা, এসি ২,১০০ টাকা; বাজেট বোর্ডিংয়ে ৩০০–৪০০ টাকায়ও থাকা যায়।
ঘণ্টায় ঘণ্টায় একদিনের প্ল্যান
সকাল ৭টা — খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে নাশতা সেরে চান্দের গাড়ি ঠিক করুন। দরদাম আগেই সেরে নিন: আলুটিলা আর রিছাং দুটো স্পট মিলিয়ে সারাদিনের ভাড়া কত, সেটা পরিষ্কার করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
সকাল ৮টা — প্রথমে রিছাং ঝরনা। কেন আগে ঝরনা? কারণ ঝরনায় নামতে ২৩৫টি সিঁড়ি ভাঙতে হয়, আর ফেরার সময় উঠতে হয় সেই একই সিঁড়ি বেয়ে। সকালের ঠান্ডা শরীরে এই ওঠানামা অনেক সহজ। দুপুরের রোদে সিঁড়ি ভাঙা কষ্টকর হয়ে যায়।
দুপুর ১২টা — ঝরনা থেকে উঠে শহরে ফিরে দুপুরের খাবার। পাহাড়ি এলাকায় ব্যাম্বো চিকেন বা স্থানীয় হোটেলের ভাত চেখে দেখতে পারেন, তবে ঝাল সহ্য করার ক্ষমতা বুঝে অর্ডার দিন।
দুপুর ২টা — আলুটিলা গুহা। দুপুরের দিকে গুহার ভেতরের ঠান্ডা আর অন্ধকারটা যেন আরও বেশি টের পাওয়া যায়। গুহা পার হতে ১০–১৫ মিনিট লাগে।
বিকেল ৪টা — আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের আশপাশ ঘুরে, চাইলে সূর্যাস্তের আগেই শহরে ফেরা। সন্ধ্যার পর পাহাড়ি রাস্তায় ঘোরাঘুরি না করাই ভালো।
রাত ৮–৯টা — ঢাকার বাস। রাতের বাস ধরলে পরদিন সকালে ঢাকায় — ছুটির দিন নষ্ট হয় না।
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ির সরাসরি বাস ছাড়ে সায়েদাবাদ, কমলাপুর আর গাবতলী এলাকা থেকে। শান্তি পরিবহন, হানিফ, এস আলম, শ্যামলী, ইকোনো, ঈগল — এই অপারেটরগুলোর বাস চলে। নন-এসি ভাড়া আনুমানিক ৭৫০–৮৫০ টাকা, এসি ১,০০০–১,৬০০ টাকা। সময় লাগে ৭–৯ ঘণ্টা, রাস্তার অবস্থা আর জ্যামের ওপর নির্ভর করে। রাতের বাস ধরাই সবচেয়ে সুবিধাজনক — সকালে খাগড়াছড়ি পৌঁছে পুরো দিনটা হাতে থাকে।
চট্টগ্রাম থেকে গেলে অক্সিজেন মোড় থেকে বিআরটিসি বা শান্তি পরিবহনের বাসে ভাড়া আনুমানিক ১৮০–২৫০ টাকা, সময় ৪–৫ ঘণ্টা। খাগড়াছড়ি শহর থেকে আলুটিলা পর্যন্ত চান্দের গাড়ি ভাড়া আনুমানিক ২,০০০–৩,০০০ টাকা (সারাদিনের জন্য), আর সিএনজি নিলে ৮০০–১,০০০ টাকা। দল ছোট হলে সিএনজি সস্তা, দল বড় হলে চান্দের গাড়িই আরামদায়ক।
আলুটিলা গুহা — মাতাই হাকর
আলুটিলা গুহার স্থানীয় নাম মাতাই হাকর। গুহাটা প্রায় ৩৫০ ফুট লম্বা, আর ভেতর দিয়ে হেঁটে পার হতে ১০–১৫ মিনিট লাগে। ভেতরে পুরো অন্ধকার — আলো ছাড়া এক পাও এগোনো যায় না। তাই গেটের কাছে থেকে বাঁশের মশাল কিনে নিন, আনুমানিক ১০–১৫ টাকা। নিজের টর্চ থাকলে সেটাও চলবে, তবে মশালের আলোয় গুহার অভিজ্ঞতাটা অন্যরকম লাগে।
ভেতরে পিচ্ছিল পাথর আর হাঁটুসমান ঠান্ডা পানির স্রোত আছে। জুতো এমন পরুন যেটা ভিজলেও সমস্যা নেই, আর হাত খালি রাখুন — পাথর ধরে ধরে এগোতে হয়। মোবাইল পলিথিনে মুড়ে নিন, কারণ ভেতরে পানি ছিটে আসে। গুহার ভেতর ছবি তুলতে চাইলে মশালের আলোই ভরসা, ফ্ল্যাশে ভালো ছবি আসে না।

ছবি: Swarup Biswas 05, CC BY-SA 4.0, via Wikimedia Commons
গুহার ওপরে পর্যটন কেন্দ্র আছে, সেখান থেকে খাগড়াছড়ি শহরের ভিউ দেখা যায়। অনেকে শুধু ভিউ দেখে চলে যান — কিন্তু গুহায় না ঢুকলে আলুটিলা আসা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আলুটিলা গুহা টিকিটের দাম আনুমানিক ৪০–৫০ টাকা, আর আলুটিলা গুহা যাওয়ার উপায় হিসেবে চান্দের গাড়িই সবচেয়ে সহজ।
রিছাং ঝরনা — ২৩৫ সিঁড়ির নিচে
রিছাং ঝরনা (অনেকে লেখেন রিসাং ঝরনা) প্রায় ১০০ ফুট উঁচু। মূল সড়ক থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয় — মোট ২৩৫টি সিঁড়ি। নামা সহজ, ওঠা কঠিন; তাই সময় হাতে নিয়ে নামুন, আর পানি সঙ্গে রাখুন। ঝরনার নিচে পাথরের ওপর দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে, পা পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে — ভেজা পাথরে দৌড়াদৌড়ি করবেন না, স্যান্ডেলের বদলে গ্রিপওয়ালা জুতো পরুন।
বর্ষায় ঝরনায় পানি বেশি থাকে, রূপও সবচেয়ে সুন্দর। শুকনো মৌসুমে পানি কমে যায়, তবে পাথর আর সবুজ ঘেরা জায়গাটা তখনও দেখার মতো। প্রবেশ ফি আনুমানিক ১০–২০ টাকা। ঝরনায় গোসলের পরিকল্পনা থাকলে বাড়তি জামা আর তোয়ালে সঙ্গে নিন — ভেজা জামায় চান্দের গাড়িতে ফেরা আরামদায়ক নয়।

ছবি: Solayman Emon, CC BY-SA 4.0, via Wikimedia Commons
খাগড়াছড়িতে খাওয়া আর থাকা
শহরে ভাতের হোটেল প্রচুর — মাছ, মাংস, ডাল, সবজি দিয়ে দুপুরের খাবার আনুমানিক ১৫০–৩০০ টাকায় হয়ে যায়। পাহাড়ি খাবার চেখে দেখতে চাইলে ব্যাম্বো চিকেনের দোকান খুঁজুন, তবে দাম আগেই জেনে নিন। পানি কিনে খান, আর ঝরনা বা গুহার পানি পান করবেন না।
এক রাত থাকতে চাইলে পর্যটন মোটেল সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ — নন-এসি আনুমানিক ১,৩০০ টাকা, এসি ২,১০০ টাকা। বাজেট কম হলে শহরের বোর্ডিংয়ে ৩০০–৪০০ টাকায় রুম মেলে, তবে আগে রুম দেখে নিন। ছুটির দিনে আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভালো, কারণ খাগড়াছড়িতে ভালো হোটেলের সংখ্যা সীমিত।
কাজের টিপস — যা না জানলে ঠকবেন
প্রথম টিপস: চান্দের গাড়ির ভাড়া দিনের শুরুতেই ঠিক করুন, আর কোন কোন স্পট ঘুরবেন সেটা মুখে বলে নিন। মাঝপথে "আরেকটা স্পট" যোগ করলেই বাড়তি ভাড়া চাওয়া হয়। দ্বিতীয়: গুহায় মশাল ছাড়া ঢুকবেন না, আর দল ছেড়ে একা এগোবেন না। তৃতীয়: ঝরনার সিঁড়িতে বয়স্ক বা ছোট বাচ্চা থাকলে সময় বেশি ধরুন, জোর করে তাড়াহুড়ো করবেন না। চতুর্থ: ফেরার বাসের টিকিট সকালে পৌঁছেই কেটে রাখুন — সন্ধ্যায় টিকিট না পেয়ে আটকে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটে।
খাগড়াছড়ি একদিনের ট্যুর প্ল্যান হিসেবে এই দুটো স্পটই যথেষ্ট। এর বেশি জায়গা একদিনে ঢোকাতে গেলে শুধু গাড়িতেই দিন কেটে যাবে, আর কোনো জায়গাই ঠিকমতো দেখা হবে না। হাতে দুই দিন থাকলে পরের দিন সাজেক বা দীঘিনালা যোগ করা যায় — কিন্তু সেটা আরেকটা পোস্টের গল্প।
খরচের হিসাব মেলাতে চাইলে অচেনা বাংলার ট্রিপ প্ল্যানারে গন্তব্য আর দিনের সংখ্যা বসিয়ে দেখে নিতে পারেন — বাজেটটা আগেই চোখের সামনে থাকলে ট্রিপে অযথা খরচ কমে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও গাইড দেখতে চাইলে বান্দরবান গাইডটাও দেখে নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন ১: একদিনে কি রিছাং ঝরনা আর আলুটিলা গুহা দুটোই দেখা সম্ভব? উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই। দুটো স্পটের দূরত্ব মাত্র ২–৩ কিলোমিটার। সকালে ঝরনা আর দুপুরে গুহা — এই ক্রমে একদিনেই দুটো আরামে ঘোরা যায়।
প্রশ্ন ২: গুহায় ঢুকতে মশাল কোথায় পাবো? উত্তর: গুহার গেটের কাছেই বাঁশের মশাল বিক্রি হয়, আনুমানিক ১০–১৫ টাকা। নিজের টর্চ থাকলে সেটাও ব্যবহার করতে পারেন।
প্রশ্ন ৩: আলুটিলা গুহার টিকিটের দাম কত? উত্তর: পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ টিকিট আনুমানিক ৪০–৫০ টাকা; ছুটির দিনে ৫০ টাকা হতে পারে।
প্রশ্ন ৪: রিছাং ঝরনায় যাওয়া কি নিরাপদ? উত্তর: সাধারণভাবে নিরাপদ, তবে পিচ্ছিল পাথরে সতর্ক থাকতে হবে। সিঁড়ি ভাঙা কঠিন বলে বয়স্কদের সঙ্গে গেলে সময় বেশি ধরুন, আর সন্ধ্যার আগে মূল সড়কে ফিরে আসুন।
প্রশ্ন ৫: Alutila Cave আর Risang Waterfall কি একই দিনে দেখা যায়? উত্তর: হ্যাঁ — Alutila Cave (আলুটিলা গুহা) আর Risang Waterfall (রিছাং ঝরনা) দুটোই খাগড়াছড়ি শহরের কাছে, একদিনের প্ল্যানে দুটোই ধরা যায়।
প্রশ্নোত্তর
একদিনে কি রিছাং ঝরনা আর আলুটিলা গুহা দুটোই দেখা সম্ভব?
হ্যাঁ, অবশ্যই। দুটো স্পটের দূরত্ব মাত্র ২–৩ কিলোমিটার। সকালে ঝরনা আর দুপুরে গুহা — এই ক্রমে একদিনেই দুটো আরামে ঘোরা যায়।
গুহায় ঢুকতে মশাল কোথায় পাবো?
গুহার গেটের কাছেই বাঁশের মশাল বিক্রি হয়, আনুমানিক ১০–১৫ টাকা। নিজের টর্চ থাকলে সেটাও ব্যবহার করতে পারেন।
আলুটিলা গুহার টিকিটের দাম কত?
পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ টিকিট আনুমানিক ৪০–৫০ টাকা; ছুটির দিনে ৫০ টাকা হতে পারে।
রিছাং ঝরনায় যাওয়া কি নিরাপদ?
সাধারণভাবে নিরাপদ, তবে পিচ্ছিল পাথরে সতর্ক থাকতে হবে। সিঁড়ি ভাঙা কঠিন বলে বয়স্কদের সঙ্গে গেলে সময় বেশি ধরুন, আর সন্ধ্যার আগে মূল সড়কে ফিরে আসুন।
Alutila Cave আর Risang Waterfall কি একই দিনে দেখা যায়?
হ্যাঁ — Alutila Cave (আলুটিলা গুহা) আর Risang Waterfall (রিছাং ঝরনা) দুটোই খাগড়াছড়ি শহরের কাছে, একদিনের প্ল্যানে দুটোই ধরা যায়।
আরও পড়ুন ও দেখুন
ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন
জায়গার বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।

