যাত্রা ও খরচ

নাফাখুম ও রেমাক্রি ভ্রমণ গাইড: পারমিট, নৌকা, গাইড — পুরো খরচের হিসাবসহ

বাংলার নায়াগ্রা নাফাখুম একদিনের জায়গা নয় — থানচি পারমিট, রেমাক্রি নৌকা, গাইড ফি আর দল অনুযায়ী খরচের পুরো হিসাব।

২৮ অক্টোবর ২০২৬· ৬ মিনিটে পড়া· MD Nayeem Hasan
নাফাখুম ঝরনা
ছবি: Laz Mahmud, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons
এই লেখায়

নাফাখুম একদিনের জায়গা নয় — এটা মেনে নিলেই ট্রিপটা অর্ধেক সফল। বাংলার নায়াগ্রা বলে চেনা এই ঝরনাটা বান্দরবানের থানচি থেকে অনেকটা ভেতরে, সাঙ্গু নদী পেরিয়ে, রেমাক্রি হয়ে হেঁটে পৌঁছাতে হয়। যাঁরা Nafakhum travel guide লিখে খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এই পোস্টের মূল বার্তা একটাই: তাড়াহুড়ো নয়, দুই দিন হাতে নিন, পারমিট আর গাইডের ধাপগুলো ঠিক রাখুন, আর দলের আকার অনুযায়ী খরচের হিসাবটা আগে থেকে মিলিয়ে নিন।

অনেক গাইডে নাফাখুমের খরচের সংখ্যাগুলো পরস্পরবিরোধী দেখায় — এক জায়গায় মোট ৪,৩০০ টাকা, আরেক জায়গায় ৮,০০০ টাকা। দুটোর কোনোটাই ভুল নয়; দুটো আলাদা ট্রিপের হিসাব। এই পোস্টে সেই পার্থক্যের কারণটা খুলে বলা হয়েছে, যাতে আপনি নিজের ট্রিপের সঙ্গে মিলিয়ে বাজেট করতে পারেন। সব অঙ্ক আনুমানিক, সেকেন্ডারি সূত্র অনুযায়ী; অফিসিয়াল ভাড়া বা অনুমতির নিয়ম যাত্রার আগে মিলিয়ে নিন।

কেন একদিনে হবে না: ২ দিনের আসল প্ল্যান

নাফাখুমের রুটটা দেখলেই বোঝা যাবে কেন একদিন অসম্ভব। ঢাকা থেকে বান্দরবান পৌঁছাতেই রাতের বাস লাগে। তারপর বান্দরবান থেকে থানচি ৪–৫ ঘণ্টা, থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকায় আরও কয়েক ঘণ্টা, তারপর রেমাক্রি থেকে নাফাখুম ২–৩ ঘণ্টা হাঁটা। একদিনে এটা করতে গেলে আপনি শুধু যাতায়াতই করবেন, ঝরনা দেখার সময় থাকবে না — আর অন্ধকারে পাহাড়ি নদীপথে ফেরা বিপজ্জনক।

ন্যূনতম প্ল্যানটা এরকম: দিন ১ — বান্দরবান থেকে থানচি, পারমিট ও গাইড ঠিক করে নৌকায় রেমাক্রি, রেমাক্রিতে রাত। দিন ২ — ভোরে হেঁটে নাফাখুম, কিছুক্ষণ থেকে ফিরে রেমাক্রি, নৌকায় থানচি, তারপর বান্দরবান। আমিয়াখুম যোগ করলে আরও দিন লাগে — সেটা আলাদা ট্রিপ হিসেবে ভাবুন, নাফাখুমের সঙ্গে জোর করে গুঁজে দেবেন না।

রুটের ধাপে ধাপে: পারমিট, গাইড, নৌকা

প্রথম ধাপ: ঢাকা থেকে বান্দরবান। নন-এসি বাস একমুখী আনুমানিক ৮০০–৯০০ টাকা, এসি ১,২০০–১,৮০০ টাকা। রাতের বাস ধরা ভালো, যাতে সকালে বান্দরবান পৌঁছে থানচির বাস ধরা যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: বান্দরবান থেকে থানচি। লোকাল বাসে ভাড়া আনুমানিক ২০০ টাকা, সময় ৪–৫ ঘণ্টা। আরাম চাইলে রিজার্ভ জিপ আনুমানিক ৫,৫০০–৬,০০০ টাকায় ৩–৩.৫ ঘণ্টায় পৌঁছায় — দলে ভাগ করে নিলে জিপের খরচটাও যুক্তিসঙ্গত হয়।

তৃতীয় ধাপ: থানচিতে গাইড ও অনুমতি। গাইড ফি আনুমানিক ১,৫০০ টাকা, আর থানচি বিজিবি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হয়। এই ধাপটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না — পারমিট ছাড়া ভেতরে যাওয়া যায় না, আর গাইড ছাড়া নদীপথ ও হাঁটাপথ দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ। গাইড ঠিক করার সময় স্পষ্ট করে নিন: তিনি শুধু থানচি থেকে রেমাক্রি পর্যন্ত, নাকি নাফাখুম পর্যন্ত সঙ্গে থাকবেন — রেমাক্রি থেকে নাফাখুমের গাইড আলাদাভাবে আনুমানিক ৫০০ টাকা ধরা হয়।

চতুর্থ ধাপ: থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকা। সাঙ্গু নদীর এই পথটাই ট্রিপের সবচেয়ে সুন্দর অংশ — দুই পাশে পাহাড়, মাঝে মাঝে ছোট ছোট পাড়া। নৌকা যাওয়া-আসা আনুমানিক ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, ৪–৫ জন বসা যায়। দূরত্ব প্রায় ২৫–৩০ কিলোমিটার নদীপথ। নৌকা ভাড়া করার সময় যাওয়া-আসা দুটোই একসঙ্গে ঠিক করুন, আর ফেরার সময়টা আগেই মিলিয়ে নিন।

পঞ্চম ধাপ: রেমাক্রি থেকে নাফাখুম হাঁটা। দূরত্ব প্রায় ৩–৪ কিলোমিটার, সময় ২–৩ ঘণ্টা। পথটা নদীর ধার ঘেঁষে, কোথাও পাথর, কোথাও কাদা। ট্রেকিং শু ছাড়া এই পথে নামবেন না। রেমাক্রিতে রাত কাটানোর ব্যবস্থা আদিবাসী ঘরে, জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০ টাকা; খাবার জনপ্রতি আনুমানিক ৮০–১২০ টাকা প্রতি বেলা।

নাফাখুম ঝরনা
নাফাখুম ঝরনা

ছবি: Laz Mahmud, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

খরচের টেবিল: দলের আকারই হিসাব বদলে দেয়

নাফাখুমের খরচে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দলের আকারের। নৌকা আর জিপের ভাড়া দলে ভাগ হয়, কিন্তু গাইড, থাকা আর খাওয়া জনপ্রতি থাকে। তাই ৪ জনের দল আর ৮ জনের দলের জনপ্রতি খরচ আলাদা হবে — এটাই স্বাভাবিক। নিচের টেবিলে ৪ জনের নাফাখুম-শুধু ট্রিপের আনুমানিক হিসাব দেওয়া হলো, সঙ্গে ৮ জনের দলের ক্ষেত্রে কী বদলায় সেটাও বলা হলো।

খরচের খাত৪ জনের দল (জনপ্রতি আনুমানিক)মন্তব্য
ঢাকা–বান্দরবান বাস (আসা-যাওয়া)~১,৬০০–১,৮০০ টাকানন-এসি একমুখী ৮০০–৯০০ টাকা ধরে
বান্দরবান–থানচি বাস (আসা-যাওয়া)~৪০০ টাকালোকাল বাস একমুখী ~২০০ টাকা
থানচি–রেমাক্রি নৌকা (ভাগ)~১,০০০–১,২৫০ টাকাযাওয়া-আসা ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, ৪–৫ জনে ভাগ
গাইড (থানচি + রেমাক্রি–নাফাখুম)~৫০০ টাকা১,৫০০ + ৫০০ টাকা দলে ভাগ (আনুমানিক)
থাকা (রেমাক্রি, ১ রাত)~১৫০ টাকাআদিবাসী ঘরে জনপ্রতি
খাওয়া (২ দিন)~৪০০–৫০০ টাকাপ্রতি বেলা ৮০–১২০ টাকা ধরে
মোট (আনুমানিক)~৪,৩০০–৪,৫০০ টাকানাফাখুম-শুধু, ৪ জনের হিসাব

৮ জনের দলে নৌকা আর জিপের ভাগ কমে, তবে অন্য একটা সূত্রে ৮,০০০–১০,০০০ টাকার নৌকার হিসাব দেখা যায় — সেটা আলাদা রুট বা বড় নৌকার হিসাব হতে পারে, গুলিয়ে ফেলবেন না। আর ৬ দিনের নাফাখুম+আমিয়াখুম ট্রিপের হিসাব আনুমানিক ৬,৫০০–৮,০০০ টাকা — সেটা দুই ঝরনা, বেশি দিন, বেশি থাকা-খাওয়ার হিসাব। তাই কোনো একটা সংখ্যাকে "সঠিক" ধরে বাজেট না করে, নিজের দল আর দিনের সঙ্গে মিলিয়ে হিসাব করুন।

রেমাক্রি খাল, সাঙ্গু নদীর পথে
রেমাক্রি খাল, সাঙ্গু নদীর পথে

ছবি: Rocky Masum, CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons

সেরা সময়: দুই মত, দুটোই সত্যি

নাফাখুম যাওয়ার সেরা সময় নিয়ে দুই সূত্র দুই কথা বলে — আর এই পোস্টে একটাকে বেছে নিয়ে অন্যটা লুকোনো হবে না। এক মত বলে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, বর্ষার পরের সময়, যখন নদীতে পানি থাকে কিন্তু প্রবাহ বিপজ্জনক নয়। আরেক মত বলে নভেম্বর থেকে মার্চ, যখন পথ শুকনো আর হাঁটা সহজ।

২৮ অক্টোবরের এই সপ্তাহটা দুই মতের মাঝখানে পড়ে — প্রথম মতের ভেতরে, দ্বিতীয় মতের ঠিক মুখে। তাই এই সময়টা দুই মতেই ভালো: পানি আছে, আবার বর্ষার বিপজ্জনক প্রবাহ নেই। বর্ষায় নাফাখুম যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যায় না — সাঙ্গু নদীর প্রবাহ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, আর প্রশাসনের অনুমতি নাও মিলতে পারে। শীতের মাঝামাঝি গেলে পানি কমে যেতে পারে, ঝরনার রূপ কিছুটা ম্লান লাগতে পারে — সেটাও জেনে যান।

আমিয়াখুম যোগ করলে কী বাড়ে?

আমিয়াখুম নাফাখুমের চেয়ে আরও ভেতরে, আরও কঠিন পথে। যোগ করলে গাইড, থাকা আর খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ২,০০০–৩,০০০ টাকা অতিরিক্ত লাগে, আর আলাদা দিনও লাগে। প্রথমবার নাফাখুম যাচ্ছেন? তাহলে আমিয়াখুম পরের ট্রিপের জন্য রাখুন। নাফাখুম ভালোভাবে দেখে, রেমাক্রির রাতটা উপভোগ করে ফেরা — এটাই প্রথম ট্রিপের সার্থকতা।

কী নেবেন, কী করবেন না

সঙ্গে নিন: জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি (পারমিটের জন্য লাগতে পারে), টর্চ, ব্যান্ডেজ, স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, ট্রেকিং শু, শুকনো খাবার, মশা তাড়ানোর স্প্রে। নেটওয়ার্ক খুব সীমিত — জরুরি কাজ, টাকা তোলা, বাড়িতে জানানো — সব আগে সেরে নিন। নগদ টাকা সঙ্গে রাখুন, কারণ ভেতরে এটিএম বা বিকাশের ভরসা নেই।

করবেন না: প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলা, স্থানীয় সংস্কৃতিকে অসম্মান করা, গাইড ছাড়া একা হাঁটা, অন্ধকারে নদীপথে চলা। রেমাক্রি আর নাফাখুমের মানুষেরা অতিথিদের আপন করে নেন — সেই আতিথেয়তার মর্যাদা রাখা ভ্রমণকারীর দায়িত্ব। আর একটা কথা: ঝরনার নিচে নামার সময় স্রোতের শক্তি আন্দাজ করে নামুন। নাফাখুমের পানি দেখতে শান্ত লাগলেও, ২৫–৩০ ফুট ওপর থেকে পড়া পানির ধাক্কা কম নয়।

নাফাখুমের ট্রিপ কঠিন, কিন্তু সেই কাঠিন্যটাই এর আসল মজা। পারমিট ঠিক, গাইড ঠিক, দলের হিসাব ঠিক — আর দুই দিন হাতে নিয়ে ধীরে যাওয়া। তাহলে বাংলার নায়াগ্রা আপনাকে হতাশ করবে না.

প্রশ্নোত্তর

নাফাখুম কি একদিনে ঘুরে আসা যাবে?

না। ন্যূনতম ১ রাত ২ দিন লাগে — দিন ১ বান্দরবান থেকে থানচি হয়ে রেমাক্রিতে রাত, দিন ২ রেমাক্রি থেকে নাফাখুম দেখে ফেরা। আমিয়াখুম যোগ করলে আরও দিন লাগে.

বর্ষায় নাফাখুম যাওয়া যায়?

পরামর্শ দেওয়া যায় না। বর্ষায় সাঙ্গু নদীর প্রবাহ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, আর প্রশাসনের অনুমতি নাও মিলতে পারে। বর্ষার পরের সময়, সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, অনেক নিরাপদ।

নাফাখুম যাওয়ার সেরা সময় কখন?

দুই মত আছে — সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, আর নভেম্বর থেকে মার্চ। ২৮ অক্টোবরের সপ্তাহটা দুই মতের মাঝখানে পড়ে, তাই এই সময়টা দুই মতেই ভালো: পানি আছে, প্রবাহ বিপজ্জনক নয়।

থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকা ভাড়া কত, কয়জন বসা যায়?

যাওয়া-আসা আনুমানিক ৪,০০০–৫,০০০ টাকা, ৪–৫ জন বসা যায়। দল বড় হলে ভাড়া ভাগ হয়ে জনপ্রতি কমে, তবে বড় নৌকার হিসাব আলাদা হতে পারে — ভাড়া করার সময় যাওয়া-আসা দুটোই একসঙ্গে ঠিক করুন।

আমিয়াখুম যোগ করলে খরচ কত বাড়ে?

গাইড, থাকা আর খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ২,০০০–৩,০০০ টাকা অতিরিক্ত লাগে, আর আলাদা দিনও লাগে। প্রথমবার নাফাখুম যাচ্ছেন, তাহলে আমিয়াখুম পরের ট্রিপের জন্য রাখাই ভালো।

আরও পড়ুন ও দেখুন

ম্যাপে দেখুন, প্ল্যান করুন

জায়গার বিস্তারিত, যাওয়ার উপায় আর খরচ দেখুন, আর নিজের ট্রিপ সাজান।

M
MD Nayeem Hasanঅচেনা বাংলা-এর লেখক

আরও পড়ুন